বিয়ের আয়োজন, নতুন জীবনের স্বপ্ন—সবই চলছিল স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু বাসররাতের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই আনন্দ রূপ নেয় সন্দেহ, উত্তেজনা ও মামলার জটিলতায়। ‘কনে বদল’-এর অভিযোগে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় বিয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিষয়টি গড়ায় আদালত ও কারাগার পর্যন্ত।
ঘটনাটি ঘটে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ভান্ডার এলাকায়। গত বছরের ১ আগস্ট রাণীশংকৈল উপজেলার বাসিন্দা জিয়ারুল হকের মেজো মেয়ের সঙ্গে একই জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর এলাকার মৃত ইব্রাহীমের ছেলে রায়হান কবিরের বিয়ে হয়। বিয়ের রাতে আনুষ্ঠানিকতা শেষে বরপক্ষ কনে নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে যায়। কিন্তু বাসররাতে কনে মুখ ধোয়ার পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায় বলে অভিযোগ করেন বর রায়হান কবির।
রায়হান কবিরের দাবি, বিয়ের আগে যাকে দেখানো হয়েছিল, বাসরঘরে উপস্থিত নববধূ সেই নারী নন। বিষয়টি বুঝতে পেরেই তিনি ও তার পরিবার কনে বদলের অভিযোগ তোলেন। পরদিন ২ আগস্ট কনেকে তার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং ঘটনার ব্যাখ্যা দাবি করা হয়।
মীমাংসা ব্যর্থ, পাল্টাপাল্টি মামলা
ঘটনার পর বিষয়টি মীমাংসার জন্য একাধিকবার দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হলেও কোনো সমাধানে পৌঁছানো যায়নি। পরে গত বছরের ২৭ আগস্ট কনের বাবা জিয়ারুল হক বর রায়হান কবির ও তার দুলাভাই মানিক হাসানকে আসামি করে ঠাকুরগাঁও আদালতে মামলা দায়ের করেন। এর পাল্টা হিসেবে ২ সেপ্টেম্বর রায়হান কবির কনের বাবা জিয়ারুল হক ও ঘটক মোতালেবকে আসামি করে আরেকটি মামলা করেন।
উভয় পক্ষের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আদালত রায়হান কবিরের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
বরপক্ষের অভিযোগ
রায়হান কবিরের মামা বাদল সাংবাদিকদের জানান, ঘটক মোতালেবের মাধ্যমে রায়হানের জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছিল। জুলাইয়ের শেষ দিকে রাণীশংকৈলের শিবদিঘী এলাকার একটি চায়ের দোকানে একটি মেয়েকে দেখানো হয়। মেয়েটি পছন্দ হওয়ায় পরবর্তীতে মেয়েপক্ষ দ্রুত বিয়ের প্রস্তাব দেয় এবং নতুন করে মেয়ে দেখানো ছাড়াই বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন করতে চাপ দেয়।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত মেকআপের কারণে বিয়ের রাতে বিষয়টি বোঝা যায়নি। তবে বাসররাতে কনে মুখ ধোয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যায় যে কনেকে বদল করা হয়েছে। তাদের দাবি, ঘটক ও মেয়ের বাবা পরিকল্পিতভাবে প্রতারণা করেছেন।
কনের বাবার বক্তব্য
সব অভিযোগ অস্বীকার করে কনের বাবা জিয়ারুল হক বলেন, বিয়ের আগে ছেলেপক্ষ তাদের বাড়িতে এসে মেয়েকে দেখেছে। বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রায় ৭০ জন বরযাত্রী উপস্থিত ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে কনে বদলের অভিযোগ অবাস্তব ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিয়ের পরদিনই ছেলেপক্ষ ১০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে। সময় দিতে না রাজি হওয়ায় তাকে হেয় করার জন্যই কনে বদলের অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ঘটক ও আইনজীবীর মন্তব্য
ঘটক মোতালেব বলেন, তিনি অন্য কোনো মেয়ে দেখাননি। মেয়েটি মেয়ের বাবার বাড়িতেই দেখানো হয়েছিল। বিয়ের পর কী ঘটেছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
এদিকে ছেলেপক্ষের আইনজীবী ও ঠাকুরগাঁও আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন বলেন, শুরুতে মীমাংসার আশায় জামিন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সমাধান না হওয়ায় বিষয়টি এখন পুরোপুরি বিচারাধীন। আদালতের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আলোচনার কেন্দ্রে ঘটনা
‘বাসররাতে কনে বদল’—এমন অভিযোগে ঠাকুরগাঁও জেলাজুড়ে তীব্র আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় মহলে ঘটনাটি ঘিরে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল দেখা দিয়েছে। এখন আদালতের রায়ের দিকেই তাকিয়ে দুই পক্ষসহ পুরো জেলার মানুষ।











