Home আন্তর্জাতিক

নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার ভাঙন ও মধ্যম শক্তির সংকট

18
0

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় আট দশক ধরে যে ‘নিয়ম-নির্ভর’ বিশ্বব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল, তা আজ এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। আন্তর্জাতিক আইন, বহুপাক্ষিকতা, মিত্রতা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্যবস্থাটি এখন বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ে কার্যত ভেঙে পড়ছে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠছে কানাডা, ইউরোপীয় দেশগুলো কিংবা অন্যান্য ‘মধ্যম শক্তির’ রাষ্ট্র।

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে এই অশনিসংকেত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বক্তব্য বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

একটি সুন্দর গল্পের করুণ পরিণতি

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর বিশ্ব দেখেছিল, কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়েছিল ইউরোপসহ তার মিত্ররা। সেই সময় ধারণা ছিল, আমেরিকা কেবল সামরিক শক্তির প্রতীক নয়, বরং গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার রক্ষক। মার্শাল প্ল্যানের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ পুনর্গঠন এবং জাতিসংঘ, ন্যাটোর মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে এক ‘হিতৈষী পরাশক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বর্ণিল গল্পের চরিত্র বদলাতে শুরু করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে এককেন্দ্রিকতা ও স্বার্থকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রবল হয়ে উঠেছে।

গ্রিনল্যান্ড সংকট ও ইউরোপের উদ্বেগ

দাভোসে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছা প্রকাশ এবং ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি তার অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং ন্যাটোতে ইউরোপের অবদান নিয়ে কটাক্ষ শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনই নয়, বরং দীর্ঘদিনের মিত্রতার ভিতেও চিড় ধরিয়েছে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই আচরণকে ‘অত্যন্ত অপমানজনক’ বলে মন্তব্য করেন। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই মনোভাব এখন আর শুধু এশিয়া বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও একই ধরনের চাপের মুখে পড়ছে।

কার্নির সতর্কবার্তা

এই প্রেক্ষাপটে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, বিশ্ব এখন কোনো সাময়িক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না; বরং এটি একটি গভীর ‘বিচ্ছেদ’-এর সময়। তার ভাষায়, যখন শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিয়ম মানার ভান ছেড়ে দিয়ে শুল্ক, বাণিজ্য বা সামরিক শক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন মধ্যম শক্তির দেশগুলোর নিরাপত্তা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

কার্নির বিখ্যাত উক্তি— “আপনি যদি আলোচনার টেবিলে না থাকেন, তাহলে ধরে নিতে হবে আপনি মেনুতেই আছেন”—আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় এক কঠিন সত্যের প্রতিফলন।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির শঙ্কা

অনেক বিশ্লেষক ট্রাম্পের এই নীতিকে উনিশ শতকের ‘মনরো ডকট্রিন’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে এককভাবে প্রভাব বলয়ের অধিপতি মনে করত। অতীতে ইরান, গুয়াতেমালা কিংবা পানামায় হস্তক্ষেপের ইতিহাস যেমন ছিল নিয়ম-বহির্ভূত ক্ষমতার উদাহরণ, বর্তমানের বাণিজ্য যুদ্ধ ও ভূখণ্ড নিয়ে চাপও তেমনই এক স্বেচ্ছাচারী প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ।

বিশ্ব রাজনীতির এই অস্থিরতা অনেকের চোখে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ব অরাজক সময়ের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেখানে কোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক নিয়ম বা ভারসাম্য ছিল না।

মধ্যম শক্তির সামনে করণীয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, গণতন্ত্র, আইনের শাসন কিংবা দায়বদ্ধ সরকার কোনো চিরস্থায়ী ব্যবস্থা নয়। এগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। বর্তমান ভঙ্গুর বিশ্বব্যবস্থায় মধ্যম শক্তির দেশগুলোর সামনে একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ হলো—পারস্পরিক ঐক্য জোরদার করা, আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক জোট শক্তিশালী করা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সম্মিলিত কণ্ঠ গড়ে তোলা।

নইলে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতার খেলায় তারা কেবল দর্শক নয়, বরং বলির পাঁঠায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

BBC News

প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ও প্রচারের জন্য যোগাযোগ করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here