Home বিশেষ বিশ্লেষণ

নির্বাচনোত্তর রাজনীতি: প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ

1
0
নির্বাচনোত্তর সময়ে দেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা বাড়ছে।

সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যবস্থার নাম গণতন্ত্র। শক্তিশালী বিরোধী দল, শিক্ষার প্রসার, আর জনগণের আর্থিক বৈষম্য কমিয়ে এনে এই ধারাকে করা যায় সবচেয়ে জনমুখি শাসনব্যবস্থা।

বিজিত দলের দায়িত্ব ও কর্তব্য বেড়ে যায় নির্বাচন পরবর্তী সময়ের রাজনীতির সাথে গণপ্রত্যাশাকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাষ্ট্র কাঠামো নির্মাণ করা।

নির্বাচনোত্তর রাজনীতিতে জনগণের প্রধান প্রত্যাশা হলো সুস্থ্য ধারার গণতান্ত্রিক ধারাকে সুসংহত করা। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ও জুলাই বিপ্লবের আকাংখা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার সাধন করা।

কিন্তু ইতিহাস থেকে আমরা দেখি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিহাস চরমভাবে প্রতিহিংসা পরায়ণ। বলা হয়ে থাকে এই প্রতিহিংসা পরাণয়তার কারণেই উদ্ভব হয়েছে ঐতিহ্যগত টক্সিক রাজনীতির।

এটা এমন এক প্রবণতা যা দশকের পর দশক শুধু বেড়েছে। ফলে ক্ষমতাসীন শাসক দল আর বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বেড়েছে দুরত্ব আর অবিশ^াস। যখন যে দল ক্ষমতায় গেছে প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে দেদারসে পরাজিত দলের উপর জুলুম নির্যাতন করেছে।

এই প্রতিশোধ প্রবণতা এতটাই স্থায়ী হয় যে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠী কোনটিই এই মানসিকতা থেকে রেহাই পায় না। আধুনিক গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির জন্য এটি এক চরম অশনি সংকেত। এতে করে সুস্থ্য ধারার রাজনীতি চর্চার পথই শুধু রুদ্ধ হয় না গণতন্ত্র বিকাশের পথ হয়ে ওঠে কণ্টকাকীর্ণ।

গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিরোধিতা, নানান মত ও পথ থাকবে। এটা নিয়ে এগিয়ে চলে গণতন্ত্রের মশাল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চা ও উন্নয়নে বিগত দিনগুলোতে তার বিন্দুমাত্র আমরা প্রত্যক্ষ করিনি।

প্রতিপক্ষকে হয়রানি, দমন পীড়ন করাই হয়ে উঠেছিল আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। গত ১২ তারিখের নির্বাচনের পর দেশে সুস্থ্য ধারার রাজনীতি র্চচা হবে বলে আমরা বিশ^াস করি। ক্ষমতাসীন দল, কোন বিশেষ দল, মত গোষ্ঠীর হয়ে কাজ না করে সবার হয়ে কাজ করবেন এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

কোন ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দল যখন কোন গোষ্ঠীর হয়ে কাজ করেন পক্ষপাতিত্ব করেন তখন সেই দল হয়ে পড়ে জনবিচ্ছিন্ন। একচোখা আর পক্ষপাতিত্বমূলক দৃষ্টিভঙ্গি শুধু নেতাই নয় ভবিষতে দেশের জন্যও নেতিবাচক ফলাফল বয়ে আনে। ক্রমবর্ধমান ভাবেই জন বিচ্ছিন্নতা দলকে করে তোলে রাজনৈতিকভাবে দুর্বিনীত।

দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশে সমস্যার শেষ নেই। রাজনীতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, মনস্তাত্বিক, আর্ন্তজাতিক প্রপঞ্চের বিচারে দেশ সমস্যাসঙ্কুল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।

অর্থনীতিতে স্বস্তি নেই, ব্যাংকিং খাতে কোন সংস্কার নেই, রাজনীতিতে অস্থিরতা বাড়ছে, সর্বত্র আইনের শাসনের অনুপস্থিতি দৃশ্যমান, চাঁদাবাজির ঐতিহ্য, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, আমদানি রপ্তানি ভারসাম্য না থাকা, বৈদেশিক ঋণের চাপ, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে মন্থরগতি,সাংবিধানিক সংস্কারে সরকারে উদ্দেশ্য প্রণোদিত কালক্ষেপণ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ব্যাপারে রাষ্ট্রের সদিচ্ছার অভাব,

আইনশৃংখলার অবনতি, নবায়নযোগ্য জ¦ালানীর সম্প্রসারণকে নিরুৎসাহিত করা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব, জনঅধিকারকে প্রাধাণ্য দেওয়ার মত সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তরিকতার পরিচয় দেবে এটাই প্রত্যাশা জনমনে।

শুধু এ গুলোই নয় আর্ন্তজাতিক শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনার মত মৌলিক সমস্যা রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনোত্তর নতুন সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বড় একটা চ্যালেঞ্জ। গত কয়েক বছর ধরে দেশের চলমান মুদ্রস্ফীতি ৮-৯ শতাংশের উপরে এই প্রবণতাকে ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনাটা সরকারের অন্যতম একটি মৌলিক কাজ।

শুধু মুদ্্রাস্ফীতই নয় জিডিপির হ্রাসবৃদ্ধিও হতাশাজনক। শুধু সেটাই নয় গত ১১ বছরে বৈদেশিক বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে কমতির দিকে এবং চলতি বছর সেটা ২২.০৩ শতাংশ যা অর্থনীতির জন্য কোন সুখকর সংবাদ নয়। নিজেদের স্বক্ষমতা যাচাই করে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের কাজটা সঠিক সময়ে করতে পারাটা সরকারের জন্য হবে বড় সফলতা।

এছাড়া দক্ষিন এশিয়ার জিও পলিটিক্স, রাজনৈতিক বোঝাপড়ার উন্নতি সাধন করাটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে বলে আমরা মনে করি। ক্ষমতাসীন দলের নিকট আমাদের প্রত্যাশা সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব সমস্যা বাছাই করে সমাধানের উদ্যোগ নিয়ে রাষ্ট্রকে সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র শান্তি ও কল্যাণমূলক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাক।

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দলমত শ্রেণি নির্বিশেষে এখন এমনটাই প্রত্যাশা সবার। রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নে বিরোধী দল, গোষ্ঠী, মত, গণমাধ্যমের জন্য এটুকু করতে না পারলে সেটা শুধু দেশের জন্যই ক্ষতিকর ক্ষতির কারণ নয় গণতন্ত্রের সুস্থ্য ধারা চালু করার ক্ষেত্রেও একটা বড় প্রতিবন্ধকতা।

গণতন্ত্রের উত্তরণে দেশের সার্বিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দেশের সকল দল ও মতের জনগোষ্ঠীকে নিয়ে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণ হয়ে উঠুক উন্নয়নের সমার্থক। একবিংশ শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে এমনটাই হোক আমাদের সার্বজনীন প্রত্যাশা।

হাসিবুল হাসান

গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষা গবেষক

প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ও প্রচারের জন্য যোগাযোগ করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here