Home জাতীয়

নারীর অধিকার ও অংশগ্রহণেই টেকসই উন্নয়ন

1
0
ছবি সংগৃহীত

আগামীকাল ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ বছরের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য— ‘Rights. Justice. Action. For ALL women and girls’। ২০২৬ সালের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জন্য এই প্রতিপাদ্য কেবল একটি স্লোগান নয়; বরং টিকে থাকা ও উন্নয়নের অন্যতম প্রধান পথনির্দেশনা।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে নারীদের অর্থনৈতিক ও নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নারী অধিকারকে কেবল মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে নারীদের অবদান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তবে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো পুরুষদের তুলনায় কম। বর্তমানে দেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ প্রায় ৪২.৭ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের অংশগ্রহণ প্রায় ৮১ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, নারীর অংশগ্রহণ যদি পুরুষদের সমান পর্যায়ে পৌঁছায়, তাহলে দেশের জিডিপি প্রায় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী এটি প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যোগ করতে পারে।

তবে কেবল অংশগ্রহণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)–এর তথ্য অনুযায়ী, কর্মজীবী নারীদের প্রায় ৯৭ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এসব খাতে চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা বা ন্যায্য মজুরির নিশ্চয়তা থাকে না।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও নিবন্ধিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাত্র ৭.২ শতাংশের মালিক নারী। এই বৈষম্য কমাতে নারীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, জামানতবিহীন অর্থায়ন এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি।

রাজনীতি ও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়েও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। যদিও বাংলাদেশে দীর্ঘদিন নারী নেতৃত্ব ছিল, তবুও তৃণমূল পর্যায় এবং উচ্চতর প্রশাসনিক কাঠামোতে নারীর উপস্থিতি এখনো সীমিত। একটি সমতা ভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হলে নারীদের নিরাপদ ও সহায়ক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

এছাড়া নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা এখনো একটি বড় সমস্যা। ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি বিবাহিত নারীদের প্রায় অর্ধেক কোনো না কোনো সময়ে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পারিবারিক সুরক্ষা আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি।

বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আইসিটি ও স্টেম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো সময়ের দাবি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের যুগে নারীদের ডিজিটাল দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করতে পারলে দেশের উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় নারীরা আর কেবল সুবিধাভোগী নন; তারা এখন পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। ঘরের কাজ থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি, ক্রীড়া ও অভিযানে নারীরা নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করছেন।

এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং সম্পত্তিতে সমানাধিকার নিশ্চিত করাই হতে পারে এবারের নারী দিবসের মূল অঙ্গীকার।

লেখক: মিনারা নাজমীন, নারী অধিকার ও জেন্ডার সমতা বিশেষজ্ঞ।

সূত্র: লেখক মিনারা নাজমীন, বিভিন্ন গবেষণা ও গণমাধ্যম প্রতিবেদন।

প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ও প্রচারের জন্য যোগাযোগ করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here