Home রাজনীতি

নির্বাচন বর্জনের পথে কি জামায়াত–এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট?

24
0

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই জামায়াত–এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ধারাবাহিক অভিযোগ তুলে আসছে। জোটের শরিক দলগুলোর দাবি, বর্তমান নির্বাচনী পরিবেশে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ অনুপস্থিত, যা একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠছে—শেষ পর্যন্ত কি নির্বাচন বর্জনের পথেই হাঁটবে ১১ দলীয় এই জোট?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ-উর রহমান মনে করেন, নির্বাচন বর্জনের সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, যদিও এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দৃশ্যমান নয়। তিনি বলেন, “মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা পেরিয়ে প্রতীক বরাদ্দ হলেও রাজনৈতিকভাবে চাইলে যেকোনো জোট নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিতে পারে। অতীতে বাংলাদেশে এমন নজির রয়েছে।”

সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত ও এনসিপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন কার্যত বিএনপির পক্ষে কাজ করছে। এমনকি নির্বাচন কমিশনে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. আব্দুল্লাহ মো. তাহের সাংবাদিকদের বলেন, “কেউ কেউ প্রকাশ্যেই বলছেন, তারেক রহমানকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়াই যেন এখন মূল লক্ষ্য।” এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জাহেদ-উর রহমানের মতে, এসব অভিযোগের পেছনে অন্তত দুই ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। একদিকে, এটি প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল হতে পারে, যা গণতান্ত্রিক রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে অস্বাভাবিক নয়। অন্যদিকে, ভবিষ্যতে নির্বাচন বর্জনের যৌক্তিকতা তৈরির প্রস্তুতিও এর মাধ্যমে সম্পন্ন হতে পারে। তিনি বলেন, “যদি নিয়মিতভাবে বলা হয় যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই, তাহলে একপর্যায়ে বলা সহজ হয়ে যায়—এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো অর্থ নেই।”

এই বিশ্লেষকের মতে, এবারের নির্বাচনী পরিবেশ অতীতের অনেক নির্বাচনের তুলনায় বেশি ভারসাম্যহীন। ১৯৯১, ১৯৯৬ কিংবা ২০০১ সালের নির্বাচনগুলো তুলনামূলকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে অনেক আগেই একটি পক্ষের বিজয় প্রায় নিশ্চিত বলে রাজনৈতিক মহলে ধারণা তৈরি হয়েছে। “বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এমন উদাহরণ খুব কম, যেখানে ভোটের আগেই এতটা নিশ্চিতভাবে বিজয়ী পক্ষ অনুমান করা যায়,”—মন্তব্য করেন তিনি।

এই ‘নিশ্চিত বিজয়ের ধারণা’ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং এমনকি গণমাধ্যমের একটি অংশকে তথাকথিত ‘সূর্যমুখী প্রবণতা’র দিকে ঠেলে দিতে পারে বলেও সতর্ক করেন জাহেদ-উর রহমান। তার ভাষায়, সম্ভাব্য ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঝুঁকে পড়ার এই প্রবণতা নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

জামায়াত–এনসিপি জোটের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো নির্বাচনে প্রত্যাশার তুলনায় কম আসন পাওয়া। বিশ্লেষকের মতে, যদি তারা বুঝতে পারে যে এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ আসনের কাছাকাছিও তারা যাচ্ছে না, তাহলে সংসদের ভেতরে কার্যকর বিরোধী রাজনীতি করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে। এতে দলের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি সমর্থকদের মনোবলও বড় ধাক্কা খেতে পারে।

এই বাস্তবতায় নির্বাচন বর্জনের হুমকি একটি ‘আলটিমেট বার্গেইনিং টুল’ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে বলে মনে করেন জাহেদ-উর রহমান। অর্থাৎ, নির্বাচনী ব্যবস্থার ভেতরে থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও বর্জনের বিষয়টি সামনে আনা হতে পারে। তবে তিনি এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেন, “নির্বাচনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিলে দেশ একেবারে অজানা পথে চলে যেতে পারে। এর পরিণতি যারা এই সিদ্ধান্ত নেবে, তাদের জন্যই সবচেয়ে বিপজ্জনক হতে পারে।”

জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গেও মত দেন এই বিশ্লেষক। তার মতে, জাতীয় পার্টি মাঠে থাকায় নির্বাচনকে পুরোপুরি একতরফা বলা কঠিন হবে, যদিও এটিকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনও বলা যাবে না। তবুও জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা হলেও বাড়ায়।

সবশেষে জাহেদ-উর রহমান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সম্ভাব্য রাজনৈতিক ফলাফল খারাপ হতে পারে—এই আশঙ্কায় যেন কোনো দল নির্বাচন থেকে সরে না যায়। “বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন সব সময়ই ছিল, এমনকি ভালো নির্বাচনগুলোর ক্ষেত্রেও। সেই বাস্তবতা মেনে নিয়েই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়াই দেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ,”—মন্তব্য করেন তিনি।

প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ও প্রচারের জন্য যোগাযোগ করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here