২০২৫ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগকে পৃথক করার উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বহুল আলোচিত এই সংস্কারকে কেন্দ্র করে রাজস্ব ক্যাডার কর্মকর্তাদের নজিরবিহীন আন্দোলন ও কর্মবিরতির কারণে দেশের রাজস্ব কার্যক্রমে মারাত্মক স্থবিরতা নেমে আসে। টানা আন্দোলন, শাটডাউন কর্মসূচি এবং অর্থনৈতিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও অধ্যাদেশে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহল রাজস্বনীতি প্রণয়ন এবং রাজস্ব আদায়ের কাজ আলাদা করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল—একই কর্তৃপক্ষ আইন প্রণয়ন ও আদায়ের দায়িত্বে থাকলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যা সুশাসন ও স্বচ্ছতার পরিপন্থী। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার অন্যতম শর্ত ছিল এই কাঠামোগত সংস্কার।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতধারী দেশগুলোর একটি—যা মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। এই প্রেক্ষাপটে কর নির্ধারণ ও কর সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে আলাদা করে দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়াতেই সরকার ‘রাজস্বনীতি বিভাগ’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ নামে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।
নজিরবিহীন আন্দোলন ও রাজস্ব অচলাবস্থা
১২ মে অধ্যাদেশ জারির পরপরই বিসিএস (কর) এবং বিসিএস (কাস্টমস ও ভ্যাট) ক্যাডারের কর্মকর্তারা আন্দোলনে নামেন। তাদের অভিযোগ ছিল—সংস্কার প্রক্রিয়ায় পেশাদার কর্মকর্তাদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে এবং প্রশাসনিক পদে নিয়োগে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে।
জুনের শেষ দিকে আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে। সারা দেশের শুল্ক ও কর কার্যালয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালিত হলে টানা কয়েক দিন রাজস্ব কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকে। এমনকি দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরও এই কর্মসূচির বাইরে থাকেনি।
এনবিআরের ইতিহাসে এর আগে কখনো এমন অচলাবস্থা দেখা যায়নি। অর্থবছরের শেষ সময়ে এই স্থবিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ে রাজস্ব আদায়ে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করে।
সমাধান, শুদ্ধি অভিযান ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
ব্যবসায়ী মহলের মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত হলেও আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে এনবিআরের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বরখাস্ত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এটিও এনবিআরের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের নেতৃত্বে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি এবং বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের ভিত্তিতে মূল অধ্যাদেশে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হয়।
সংশোধিত কাঠামোতে কী পরিবর্তন
রাজস্বনীতি বিভাগ:
সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, এই বিভাগের সচিব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সামষ্টিক অর্থনীতি, বাণিজ্যনীতি বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। আগে যেখানে যে কোনো ‘যোগ্য’ সরকারি কর্মকর্তাকে নিয়োগের সুযোগ ছিল, সেখানে এখন অভিজ্ঞতার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ:
এ বিভাগের ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট নির্দেশনা যুক্ত করা হয়েছে। সংশোধনী অনুযায়ী, রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমে বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন কর্মকর্তাদেরই সচিব পদে নিয়োগ দিতে হবে।
বর্তমানে দুটি পৃথক বিভাগের বাস্তবায়ন কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। এনবিআরের বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালেই রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
ইত্তেফাক/এসএএস










