রাজনৈতিকভাবে ক্রমেই চাপে পড়ছে নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি ঐক্য গঠনের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দলটির ভেতরে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে, যা ইতোমধ্যে বড় ধরনের ভাঙনে রূপ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের পরিচিত মুখগুলোর বড় অংশই দল ছাড়ছেন কিংবা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই এনসিপির কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংখ্যা বেড়ে এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেন্দ্রীয়সহ সারা দেশে দলটির অধিকাংশ পরিচিত নেতা আর এনসিপির সঙ্গে নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি এনসিপির জন্য বড় ধরনের সাংগঠনিক ও আদর্শিক সংকেত বহন করছে।
এরই মধ্যে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের হলফনামায় প্রদর্শিত আয় নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ফলে এনসিপি একদিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অন্যদিকে বাহ্যিক রাজনৈতিক চাপ—দুই দিক থেকেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সম্পৃক্ত যোদ্ধা, শহীদ পরিবার ও আহতদের একটি অংশ মনে করছেন, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতার মধ্য দিয়ে এনসিপি তাদের ঘোষিত আদর্শ থেকে সরে এসেছে। তাদের ভাষ্য, এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই একের পর এক কেন্দ্রীয় নেতা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা দল ছাড়ছেন। অনেকে একে ‘চরম আদর্শবিরোধী’ ও রাজনৈতিকভাবে ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখছেন।
বৃহস্পতিবার রাতে এনসিপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, মুখপাত্র, যুগ্ম সদস্য সচিব ও মিডিয়া সেলের প্রধান মুশফিক উস সালেহীন সব ধরনের পদ-পদবি থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি একই সঙ্গে পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ উইংয়ের কো-লিডের দায়িত্বেও ছিলেন। একই দিনে পদত্যাগ করেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন।
এর আগে ১ জানুয়ারি রাতে পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ উইংয়ের প্রধান খালেদ সাইফুল্লাহ। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা এই নেতা এনসিপি গঠনের পর থেকেই নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিলেন। তার স্ত্রী ডা. তাসনিম জারাও গত ২৮ ডিসেম্বর এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ঢাকা-৯ আসনে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী হলেও তিনি এখন স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
পদত্যাগের পর মুশফিক উস সালেহীন বলেন, দলের ভেতরে মতবিরোধ চরমে পৌঁছে প্রকাশ্য বিভক্তিতে রূপ নিয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট ও আসন সমঝোতার সিদ্ধান্তই এই সংকটের মূল কারণ। তার মতে, এনসিপি যে নতুন ধারার রাজনীতির কথা বলে যাত্রা শুরু করেছিল, সেই জায়গা থেকে দলটি সরে গিয়ে পুরোনো বন্দোবস্তের রাজনীতির সঙ্গে আপস করেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম বলেন, ছাত্র-জনতার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত এনসিপির প্রতি শহীদ পরিবারগুলোর প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু একের পর এক পরিচিত মুখের পদত্যাগে তারা হতাশ হচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শহীদ পরিবারের সদস্য বলেন, এনসিপির এই ভাঙন তাদের ন্যায্য দাবি আদায়কে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
এনসিপির একাধিক নেতার অভিযোগ, জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দলের ‘বিশেষ’ দুই শীর্ষ নেতার মতই প্রাধান্য পেয়েছে, কেন্দ্রীয় কমিটির অধিকাংশ নেতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। ফলে অনেকেই রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
এ পর্যন্ত এনসিপি থেকে অন্তত ১৪ জন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন—ডা. তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীন, ফারহাদ আলম ভূঁইয়া, আরিফ সোহেল, আজাদ খান ভাসানী, আসিফ নেহাল, মীর হাবিব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ, মীর আরশাদুল হক, খালেদ সাইফুল্লাহ, খান মো. মুরসালীন, মুশফিক উস সালেহীন, ওয়াহিদুজ্জামান ও আল আমিন টুটুল।
এ বিষয়ে এর আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, দলে থাকা বা নির্বাচন করা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তবে তার এমন বক্তব্যের পর দল থেকে পদত্যাগের হার আরও বেড়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ মনে করেন, নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির জন্য এই ভাঙন বড় ক্ষতি। বিশেষ করে জামায়াত ইস্যুতে দলের নারী নেতৃত্বের বড় একটি অংশ সরে যাওয়ায় দলটি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, দলে থাকা শীর্ষ নেতাদেরই এখন প্রমাণ করতে হবে—এনসিপি এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে কি না। নচেৎ দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।










