Home জাতীয়

ইরানে অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে গণঅভ্যুত্থান, শত শত নিহত

16
0

ইরানের ইতিহাসে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকট ও জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড দরপতনের প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন দেশজুড়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছে। গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের প্রধান বাজারগুলো থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন কয়েক দিনের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রায় সব প্রদেশে। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে এ পর্যন্ত শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন এবং গ্রেফতার হয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

প্রথমদিকে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে ওঠার প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়। এখন এই বিক্ষোভ সরাসরি বর্তমান ইসলামি শাসনব্যবস্থা ও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিরুদ্ধে এক দফার আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের মুখে শোনা যাচ্ছে সরকার পতনের স্লোগান এবং শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দাবি।

আন্দোলনের সূচনা হয় ২৮ ডিসেম্বর, যখন ইরানের জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের মান মার্কিন ডলারের বিপরীতে ১৪ লাখ ২০ হাজারে নেমে আসে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারসহ প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে রাস্তায় নামেন। পরদিনই এই বিক্ষোভ ইসফাহান, মাশহাদ, শিরাজ, তাবরিজসহ অন্যান্য বড় শহরে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতির চাপে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান মোহাম্মদ রেজা ফারজিন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

৩০ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের আশ্বাস দেন। তবে তার এই আশ্বাসে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। বরং ৩১ ডিসেম্বর থেকে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ আরও তীব্র ও সহিংস রূপ নিতে শুরু করে। সরকারি ভবন, ব্যাংক ও নিরাপত্তা বাহিনীর স্থাপনায় হামলার ঘটনাও ঘটে।

নতুন বছরের শুরুতেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ১ জানুয়ারি লরেস্তান প্রদেশের আজনা শহরসহ কয়েকটি এলাকায় সংঘর্ষে অন্তত সাতজন নিহত হওয়ার খবর জানায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। ২ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক সতর্কবার্তায় বলেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর ইরান সরকার সহিংসতা চালালে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। এই বক্তব্যের পর আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয় এবং ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সবকটিতেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

৩ জানুয়ারি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাবাসী’ আখ্যা দিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তার এই বক্তব্যের পর নিরাপত্তা বাহিনী আরও কড়াকড়ি আরোপ করে এবং ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। বিভিন্ন শহরে সেনা ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৮ জানুয়ারি সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা ও আন্তর্জাতিক টেলিফোন সংযোগ বন্ধ করে দেয়। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ ও ইরান হিউম্যান রাইটস-এর তথ্যমতে, এই ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সুযোগে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক দমন-পীড়ন চালায়। ১০ জানুয়ারি নাগাদ নিহতের সংখ্যা শতাধিক বলে জানানো হলেও, ১১ ও ১২ জানুয়ারির মধ্যে এই সংখ্যা ৫৫০ ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করছেন অধিকারকর্মীরা। কোনো কোনো সূত্রের মতে, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ২ হাজার বা তারও বেশি হতে পারে।

বর্তমানে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারসহ বিভিন্ন শহরের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। স্কুল-কলেজ ও অনেক সরকারি অফিস বন্ধ রয়েছে। এদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান আলোচনার প্রস্তাব দিলেও দমন-পীড়ন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।

ইরানের এই অস্থির পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দুরবস্থা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার ফলেই দেশটি এখন এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে, যা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

সূত্র: গালফ নিউজ

প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ও প্রচারের জন্য যোগাযোগ করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here